Buty Obuwie

Newspaper headlines: 'PM vows to act' and 'Brace for more terror attacks'

· BBC News

জব্বার মিঞার বলীখেলা আর মেলায় ঘুরে বেড়ানো

· Prothom Alo

এসবই এখন স্মৃতি। তিন দশক পেরিয়ে এসেছি সেই পুরোনো জীবন ছেড়ে।

মেলা মানে জীবনের উৎসব। মেলা মানে জীবনের সঙ্গে জীবন মিলিয়ে দেওয়া। মেলা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। যে সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়ে থাকে মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য পরম্পরার দীর্ঘ ইতিহাস। সারা বছর আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কখন জব্বার মিঞার বলীখেলা হবে। চট্টগ্রামের একটি ঐতিহাসিক বড় মেলা জব্বার মিঞার বলীখেলা। আঞ্চলিক ভাষায় বলীখেলার মানে হলো কুস্তি লড়া। শহরের লালদীঘির মাঠে এই কুস্তির লড়াই বসে। তাবড় তাবড় সব পালোয়ান, কুস্তিগিররা ঢাক ঢোল বাজিয়ে, ব্যান্ড পার্টি নিয়ে মেলার মাঠে এসে হাজির হন।

চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই মেলা চালু করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে খান বাহাদুর উপাধি দিতে চেয়েছিল। স্বদেশপ্রেমী আবদুল জব্বার সেই খেতাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

Visit tr-sport.bond for more information.

এই কুস্তির লড়াই ঘিরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে বসে মেলা। কোতোয়ালি থানার মোড় থেকে একেবারে লালদীঘি, চট্টগ্রাম শহীদ মিনার পর্যন্ত দীর্ঘ অঞ্চলজুড়ে বড় রাস্তার ওপর বসে এই মেলা। এই রাস্তায় ১০–১২ দিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। শহরের ব্যস্ত বড় রাস্তার ওপরে এত বড় মেলা বসে, আর কখনো কোথাও দেখিনি। যদিও ৩৩ বছর আগে যেভাবে মেলাটা শেষ দেখে এসেছি, এখন দূর থেকে খবর পাই, মেলার সময় এবং পরিসর দুটোই সংকুচিত হয়েছে।

আমাদের বাসা পাথরঘাটা জাইল্যাপাড়া থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না মেলা। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে, কখনো ছোট মামা তপন, কখনো বড় মাসির ছেলে উজ্জ্বলের হাত ধরে মেলায় যেতাম। বড় মামার ছেলে রতন মেলা থেকে বেলা বাঁশি এনে দিতেন। ঘর ঘর অ্যালফাবেট বা নম্বর মেলানোর একটা খেলা এনে দিতেন।

আমার বাবার সংস্থায় কাজ করতেন গুরুসদয় কাকু। তিনিও ঢোল, হেডফোন এসব কিনে দিতেন। হেডফোন মানে এখনকার মতো গান শোনার হেডফোন নয়। দুই কানে হেডফোন লাগিয়ে লম্বা তারের অন্য প্রান্তে কেউ কথা বললে, তা শোনা যেত। তখন সেটাই ছিল বেশ মজার একটা উদ্ভাবন, খেলনা। আবার বাংলাদেশের ছোটদের জন্য তৈরি ঢোলও ছিল একেবারে বড় ঢোলের মতো অবিকল কাঠের খোলস এবং দুই পাশে চামড়া দিয়ে বানানো। তাকদুম তাকদুম বড় ঢোলের মতো বাজে। কলকাতার মেলায় ছোটদের ঢোল দেখেছি টিনের আবরণ এবং দুই পাশে পাতলা ধাতব বা প্লাস্টিকের কিছু দিয়ে তৈরি। বাজালে ড্রাম বাজানোর মতো শব্দ হয়। ছোটবেলার ঢোলের শব্দ তাই প্রাণে প্রাণে, কানে কানে হারাই।

যখন জে এম সেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রাইমারিতে পড়ি, বন্ধু ধীমান, জুয়েল, জ্যোৎস্না আখতার, শিমুলের সঙ্গে মেলায় যেতাম। খুব বেশি ঘোরা হতো না। মা ভয় দেখাতেন, ছোট বাচ্চারা ঘুরে বেড়ালে ছেলেধরা এসে ধরে নিয়ে যাবে। অদ্ভুত সব ছেলেধরার গল্প আমাদের ঘিরে থাকত তখন।

পরে যখন নিউমার্কেটের পাশে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুলে গিয়ে ভর্তি হলাম, বুকে তখন অনেক সাহস। ছেলেধরাকে কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়, জেনে গেছি। পাথরঘাটা জাইল্যাপাড়া থেকে স্কুলে যাওয়ার পথেই পড়ত এই মেলা। স্কুল ছুটির পর রোজ এক ঘণ্টা মেলায় ঘুরে তবেই বাসায় ফিরতাম।

তখন পায়ে থাকত জাগুয়ার কেডস। এই জুতা নতুন বেরিয়েছিল। বাবা কিনে দিয়েছিলেন। ছিল পোলার আইসক্রিম। এমনিতে আইসক্রিমওয়ালারা ঘুরে ঘুরে আইসক্রিম বিক্রি করে। কিন্তু এই প্রথম পোলার আইসক্রিম কোল্ড ড্রিংকসের মতো দোকানে দোকানে বিক্রি হতে শুরু করেছে। চকলেটের ফ্লেভার লাগানো আইসক্রিম, কাপ আইসক্রিম। আবার বাক্স ভরা আইসক্রিমও ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম। মামার মেজ ছেলে সুজয়দা ঢাকাতে ব্যাংকে চাকরি করতেন। চট্টগ্রামে এলে এই বাক্স আইসক্রিম কিনে খাওয়াতেন।

চট্টগ্রাম নগরে আবদুল জব্বারের বলীখেলার সময় বৈশাখী মেলা বসে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য নিয়ে আসেন দোকানিরা

নতুন বছর আসার সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ মাসের শুরুতেই মেলার বাঁশি বেজে উঠত। কত রকমের বাঁশের বাঁশি, প্লাস্টিকের বাঁশি, ছোটদের বড়দের একতারা, খঞ্জনি, কীর্তনের জুড়ি, কাঁসা, তবলা, মৃদঙ্গ এসব পাওয়া যেত। বাঁশের, বেতের তৈরি আসবাবপত্র, মোড়া, কুলা, চালুনি, ঝাড়ু, ঝাঁটা, শীতলপাটি, তালপাতার পাখা, মাদুর, ঘর সাজানোর কত রকম জিনিস মেলায় উপচে পড়ে। শীতলপাটি নামেও সুখ, আমরা বাসার মেঝেতে পেতে ঘুমাতাম।

তরমুজ আসত। ২০–৩০ কেজি ওজনের তরমুজও দেখে অবাক বনে যেতাম। ঠেলাগাড়িতে করে এই তরমুজ নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের তরমুজের বাহ্যিক আবরণের রং লাউ কিংবা কদুর মতো। এপার বাংলার তরমুজ দেখতে গাঢ় সবুজরঙা। ভেতরে কাটলে দুটোই অবশ্য রসে টইটম্বুর, গাঢ় লাল। বড় বড় শসা একেকটার ওজন তিন–চার কেজি, আমরা বলতাম মারফা। এই শসা দিয়ে ডাল অথবা ইঁচা (ছোট চিংড়ি) মাছ দিয়ে রান্না করা হবে। শুঁটকি দিয়ে রান্না করলেও ভালো লাগে। মেলায় কেউ গ্রাম থেকে আনা ফ্যালন ডাল বিক্রি করে, কেউ শিমের দানা।

খেলনা বাটির দোকানে ছোট ছোট হাঁড়ি, কড়াই, থালাবাসন, গাড়ি, পুতুল, টেলিফোন, জলের ওপরে ভটভট করে ঘুরছে সাম্পান। কিছুই না, ভেতরে শুধু একটা তেলের বাতি জ্বালিয়ে রাখলেই সাম্পান চলতে থাকে। আমরা কর্ণফুলীর পারের সন্তান, ছোট্ট ভটভটি এই সাম্পান দেখলেও বুকের ভেতর ঢেউ খেলে যায়। মাটির পুতুলের পসরা সাজিয়ে বসে অনেকে। কক্সবাজারের ঝিনুকের পুতুলও আসে। তবে মাটির পুতুল, মাটির হাঁড়ি, সরা, কলসি বিক্রি হয় বেশি। কারণ, কক্সবাজারের পুঁতির মালা, ঝিনুকসামগ্রী মানুষ কক্সবাজারে গিয়েই কিনতে ভালোবাসে। আমি মেলায় ঘুরে ঘুরে নিজে কিনতে পেরেছি খুব কম। স্কুলজীবনে পকেটে আর পয়সা কোথায়? মা রোজ এক টাকা করে দিতেন টিফিন খেতে। মেলার জন্য অবশ্য সামান্য বাড়তি কিছু পাওয়া যেত। কেনার চেয়ে ঘুরে দেখে দেখে আনন্দ পেয়েছি বেশি। একবার মাটির তৈরি রামকৃষ্ণ, সারদা দেবী আর বিবেকানন্দের মাটির মূর্তি কিনে এনেছিলাম। শেখ মুজিবের বড় একটা ছবিও কিনে এনেছিলাম একবার।

আমাদের দুই ভাইকে বাসায় পড়াতে আসতেন সুভাষদা। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং শহরের বড় ছাত্রনেতা ছিলেন। চট্টগ্রাম শহরের তখন আওয়ামী লীগের বড় নেতা ছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। আমাদের পাথরঘাটা বাসার কাছে একটা রাজনৈতিক পথসভার পরে সুভাষদা মহিউদ্দিন সাহেবকে কিছুটা সময় জিরানোর জন্য আমাদের বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। ঘরে শেখ মুজিবের ছবি দেখে তিনি বেশ খুশি হয়েছিলেন। আমার মা সবাইকে শরবত বানিয়ে খাওয়ান।

জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা

মেলায় ভাইকে নিয়ে নাগরদোলায় চড়েছি। বোনের জন্য চুলের ফিতা, কাচের চুড়ি কিনে এনেছি। দইয়ের শরবত, রঙিন বরফের আইসক্রিম, আচার, চটপটি কিনে খেয়েছি। আর সেটাই ছিল চট্টগ্রাম শহরে স্মৃতির পাতায় আমার শেষ মেলা।

লালদীঘির জলে মাছ ভেসে বেড়াত। একবার খবর হলো একটা মানুষ দুদিন জলের নিচে ডুবে থাকবে। বন্ধুমহলে এ ঘটনা সাড়া ফেলে দিল। দেখতে যাওয়া অবশ্য হয়নি। বলীখেলাও আর কখনো দেখা হয়নি। ওখানে এত ভিড় হয়, বড়দের ঠেলে ছোটরা ঢুকবে কী করে! তবে বলীখেলা নিয়ে কৌতূহলের অন্ত থাকত না। ভাই রনীর সঙ্গে, বন্ধু অ্যালভেনের সঙ্গে বিছানার ওপরে কুস্তি লড়তাম। জাঙ্গিয়া পরে দুই পাশে নিজের থাইয়ের ওপর প্রতিপক্ষকে জব্দ করতে এমনভাবে থাবড়া মারতাম, নিজেকে মনে হতো যেন সুমো পালোয়ান।

জব্বার মিঞার বলীখেলাতে ঘুরতে ঘুরতেই চট্টগ্রামের শহীদ মিনারের উল্টো দিকে শহরের বড় লাইব্রেরির খোঁজ পেয়েছিলাম। ওখানে একটা মুসলিম ইনস্টিটিউট হল আছে। লাইব্রেরির ওপরের তলায় বাংলা বই থাকে, নিচে ইংরেজি বই। এরপর সেই লাইব্রেরিটাই হয়ে উঠল আমার বিকেলের আস্তানা। সপ্তাহে দুই–তিন দিন ওখানে গিয়ে বই পড়ি। বাংলা–ইংরেজি দুটি লাইব্রেরির দু–তিনজন কর্মীর সঙ্গেও ভাব হয়ে গেল।

এসবই এখন স্মৃতি। তিন দশক পেরিয়ে এসেছি সেই পুরোনো জীবন ছেড়ে। জব্বার মিঞাকে কখনো দেখিনি। ছোটবেলা থেকে মেলার সঙ্গে জব্বার মিঞার নাম হাসি-আনন্দে জুড়ে আছে মাত্র। মনে মনে কল্পনা করেছি তাঁকে। স্বপ্নে দেখেছি। স্বপ্নে জব্বার মিঞার সঙ্গে এখনো অবশ্য দেখা হয়। চাটগাঁইয়াতে জিজ্ঞাসা করি, ‘অদা কেন আছন?’ তিনি হেসে উত্তর দেন, ‘আঁই ভালা আছি। তুইই ভালা না? তুইই তো এহন বর ডর হয় গিয়ু গৈ বদ্দা! আঁরে ভুলি গিয়ু!’
হেসে বলি, ‘ও বদ্দা আঁই তুয়ারে ন ভুলি, আঁই আইজও ছোড আছি, তুয়ার মেলাত আবার যাইয়ুম, কনো একদিন!’

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। ফুল রাখি। চোখে জল চলে আসে। শহীদ ভাইয়েরা ওখানে ঘুমিয়ে আছেন। তাঁদের জন্য মেলা তো কখনো আসে না। তাঁরা বর্ণমালার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। সেই বর্ণের সঙ্গে বর্ণের মালা যেন জুড়ে দেয় এই প্রাণের মেলা।

মানুষের প্রাণের ভেতরে যত দিন শ্বাস থাকে, ভাষার প্রদীপ, সংস্কৃতির প্রদীপ, স্মৃতির প্রদীপ মিটমিট করে কেবল জ্বলতে থাকে। জ্বলতেই থাকে। ছোটবেলার নাগরদোলা ঘুরতে থাকে। জীবনের চাকা কেবল আমাদের কোথা থেকে কোথায় এনে নির্বাসিত করে।

হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

Czytaj dalej u źródła

কালীগঞ্জে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল যুবকের

· Kaler Kantho