Buty Obuwie

হারিয়ে গিয়ে খুঁজে পাওয়া এক ভোর

· Prothom Alo

পাহাড়ের প্রতি আমার দুর্বলতা অনেক দিনের। সমুদ্রের বিশালতা মানুষকে মুগ্ধ করে, কিন্তু পাহাড় মানুষকে ডাকে। সেই ডাকে সাড়া দিয়েই ইউনিভার্সিটি ট্যুরিস্ট সোসাইটির সঙ্গে রওনা দিয়েছিলাম বান্দরবানের মারায়ং তংয়ের উদ্দেশে।

মারায়ং তং বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ ফুট উঁচু এই পাহাড়ের নাম শুনলেই মনে হয় কোনো পৌরাণিক কাহিনির কথা বলা হচ্ছে। পাহাড়প্রেমীদের কাছে এটি স্বপ্নের এক গন্তব্য। বহুদিন ধরেই ইচ্ছা ছিল সেখানে যাওয়ার। অবশেষে সুযোগ এল।

Visit sweetbonanza-app.com for more information.

যাওয়ার আগে ইউটিউবে অসংখ্য ট্রাভেল ভ্লগ দেখেছিলাম। মেঘের সমুদ্র, পাহাড়ের মাথায় ক্যাম্পিং, সূর্যোদয়ের অপার্থিব দৃশ্য সবকিছু যেন আমাকে অস্থির করে তুলছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটি ভ্রমণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

আলীকদম পৌঁছে পাহাড়ে ওঠা শুরু হলো। প্রথম দিকে পথ সহজই মনে হচ্ছিল। চারদিকে সবুজ পাহাড়, দূরে দূরে জুমচাষের জমি, পাহাড়ি শিশুদের হাসিমুখ, আর মাঝে মাঝে মেঘ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর।

আমরা সবাই গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পাহাড়ে একটি ছোট ভুলও কখনো কখনো বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একসময় বুঝতে পারলাম, আমি আর আরও তিনজন মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি।

প্রথমে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম, একটু এগোলেই সবাইকে পেয়ে যাব। কিন্তু যত এগোচ্ছি, ততই বুঝতে পারছি আমরা ভুল পথে চলেছি। যেখানে ক্যাম্পিং করার কথা ছিল, সেখানে পৌঁছানোর বদলে আমরা উঠে গেছি আরও উঁচুতে। অনেকক্ষণ পর হঠাৎ সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুক কেঁপে উঠল।

আমরা পাহাড়ের এক চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। কোথাও কোনো মানুষ নেই। আমাদের দলের কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

তখনো পুরোপুরি অন্ধকার নামেনি। কিন্তু পাহাড়ের আবহাওয়া যে কত দ্রুত বদলে যেতে পারে, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম।

হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে গেল।

তারপর শুরু হলো ঝড়।

প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ভয়ংকর বাতাস একসঙ্গে আঘাত হানল পাহাড়ের গায়ে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন মুহূর্তের মধ্যে তার শান্ত মুখোশ খুলে ফেলেছে।

বাতাস এত জোরে বইছিল যে দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছিল। পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতিটা তখন সত্যিই ভীতিকর।

আমরা আশ্রয়ের খোঁজে হাঁটতে শুরু করলাম।

বৃষ্টি তখন শরীর ভিজিয়ে একাকার করে ফেলেছে। পিচ্ছিল পথ, অন্ধকার আর অজানা ভয়ের মধ্যে সামনে এগোচ্ছি।

ঠিক তখনই দূরে একটি ছোট মন্দির দেখতে পেলাম।

সেই মুহূর্তে মন্দিরটিকে আমাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে হয়েছিল।

ভেতরে ঢুকে বুঝলাম, নিরাপত্তা আসলে আপেক্ষিক ব্যাপার।

টিনের চালের ওপর বৃষ্টির আঘাতে বিকট শব্দ হচ্ছিল। মেঝেতে হাঁটুসমান পানি জমে গেছে। আমরা ছাড়াও কয়েকজন অপরিচিত যুবক সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের আচরণ দেখে আমাদের অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল।

আমাদের সঙ্গে থাকা তিথি আপু প্রথম থেকেই খুব ভয় পাচ্ছিলেন। ঝড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কান্নাও বাড়তে লাগল। একসময় আতঙ্কে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন।

সেই মুহূর্তে নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছিল।

মোবাইলে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। কাউকে ফোন করা যাচ্ছে না। সাহায্য চাওয়ার কোনো উপায় নেই।

আমি চুপ করে বসে ছিলাম।

মনে হচ্ছিল, এটা নিশ্চয়ই কোনো দুঃস্বপ্ন।

অনেক থ্রিলার উপন্যাস পড়েছি। বহু অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা দেখেছি। কিন্তু বাস্তবের ভয় যে এত তীব্র হতে পারে, তা আগে কখনো বুঝিনি।

বৃষ্টি কিছুটা কমার পর আমরা নিচে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম।

পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ ধরে সতর্কভাবে নামতে লাগলাম। অন্ধকারের মধ্যে প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। অবশেষে অনেক খোঁজাখুঁজির পর ক্যাম্পিং স্পটে আমাদের দলের অন্য সদস্যদের খুঁজে পেলাম।

কিন্তু বিপদ তখনো কাটেনি।

অবিরাম বৃষ্টির কারণে ক্যাম্পিং বাতিল করতে হলো। আশ্রয় নেওয়া হলো একটি ছোট চায়ের দোকানে।

একটিমাত্র ঘর। চল্লিশজনের বেশি মানুষ। বসার জায়গা পর্যন্ত নেই। ভেজা কাপড়, ক্লান্ত শরীর আর অনিশ্চয়তায় ভরা মন নিয়ে আমরা গাদাগাদি করে বসে ছিলাম।

হঠাৎ দোকানদারের ফোন বেজে উঠল।

পুলিশ।

পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। সবাইকে অবিলম্বে নিচে নামতে হবে। ইতিমধ্যে ১১ নম্বর বিপদসংকেত চলছে।

কথাগুলো শুনে মনে হলো, বিপদ যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অন্য পর্যটকদের অনেকেই নিচে নেমে গেল। কিন্তু আমাদের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। গভীর রাত, প্রবল বৃষ্টি আর বিপজ্জনক পাহাড়ি পথ—সব মিলিয়ে ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব।

সেদিন রাতটা ছিল আমার জীবনের দীর্ঘতম রাত।

সময় যেন থেমে গিয়েছিল।

ঝড়ের শব্দ, বৃষ্টির শব্দ আর অদ্ভুত এক অস্থিরতা নিয়ে রাত কেটে যাচ্ছিল।

কিন্তু পৃথিবীর সব রাতেরই যেমন শেষ আছে, এই রাতেরও ছিল।

ভোর চারটার দিকে বাইরে বের হয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আকাশভরা অসংখ্য তারা। এত তারা আমি জীবনে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, পুরো আকাশজুড়ে কেউ হিরের কণা ছড়িয়ে দিয়েছে।

আর কয়েক ঘণ্টা আগের সেই উন্মত্ত ঝড়?

সেই ভয়?

সেই আতঙ্ক?

সবকিছু যেন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল।

এরপর ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করল। আর তখনই দেখা দিল সেই দৃশ্য, যার জন্য মানুষ কষ্ট করে পাহাড়ে ওঠে। আমাদের সামনে মেঘের সমুদ্র। সাদা তুলোর মতো মেঘ পাহাড়ের নিচে ভেসে বেড়াচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছিল সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা দ্বীপ। আমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রকৃতি যেন তার সব সৌন্দর্য একসঙ্গে মেলে ধরেছে।

হঠাৎ মনে হলো, জীবনের অনেক সত্য হয়তো পাহাড় শেখায়।

অন্ধকার রাত চিরস্থায়ী নয়।

ভয় চিরস্থায়ী নয়।

ঝড়ও চিরস্থায়ী নয়।

সবচেয়ে কঠিন রাতের পরেও ভোর আসে।

আর সেই ভোর কখনো কখনো এত সুন্দর হয় যে আগের সব কষ্ট সার্থক মনে হয়।

আজও মারায়ং তংয়ের কথা মনে পড়লে প্রথমে সেই ভয়ংকর রাতটার কথা মনে পড়ে। তারপর মনে পড়ে ভোরের মেঘসমুদ্রের কথা। আর তখন মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো হয়তো হারিয়ে যাওয়া পথ, ঝড়, অন্ধকার আর বেঁচে ফেরার স্মৃতি থেকেই জন্ম নেয়।

লেখক: নুসরাত রুষা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Czytaj dalej u źródła

KEEPING TABS: Pricey World Cup keeps fans away, hits US hotels, airlines

· Daily Maverick

Kalshi promo code NYPMAX: Trade $10, get $10 for NBA Finals MVP markets

· NY Post

Trade $10, get $10 for NBA Finals MVP markets with the Kalshi promo code NYPMAX.

Visit tr-sport.click for more information.

Czytaj dalej u źródła